
দেশে হামের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬৮৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচজন করে মারা গেছেন। এর মধ্যে ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘ডেন-৩ সেরোটাইপ’ শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। ফলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে। এগুলো হলো ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। কোনো ব্যক্তি একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর ওই ধরনটির বিরুদ্ধে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তবে অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে শারীরিক জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
দেশে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ডেঙ্গুর ডেন-২ সেরোটাইপের প্রাধান্য ছিল। তবে চলতি বছর ডেন-২-এর পাশাপাশি ডেন-৩ সেরোটাইপও শনাক্ত হচ্ছে।
পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশনের অংশ হিসেবে আইইডিসিআর বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করেছে। চলতি বছরের জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নমুনা জরিপ করা হয়। এতে বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে ডেন-৩ সেরোটাইপের উপস্থিতি বেশি পাওয়া যায়। অন্যদিকে একই জেলার গ্রামাঞ্চলে ডেন-২-এর আধিক্য ছিল। বান্দরবানেও ডেন-২ সেরোটাইপে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি পাওয়া গেছে।
আইইডিসিআরের মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ জানিয়েছেন, ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে প্রতিবছর বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে এনএস-১ পজিটিভ রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে সেরোটাইপিং করা হয়।
এ বছর ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে জুলাইয়ের শেষদিকে ও আগস্টের শুরুতে সংগ্রহ করা নমুনাও পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭১টি নমুনার সেরোটাইপিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি নমুনায় ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে, যা মোট নমুনার প্রায় ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি নমুনাগুলোতে ডেন-২ সেরোটাইপ পাওয়া গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের মতে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু শহর বা নগরকেন্দ্রিক রোগ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ন, ক্যান ও প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এসব বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখার কারণে সারা দেশেই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া পানি সংকটের কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমিয়ে রাখার প্রবণতাও এডিস মশার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। ফলে গ্রাম থেকে শহর, এমনকি পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকাতেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে।
পাহাড়ি অঞ্চলেও এডিস মশার প্রজননের জন্য বিভিন্ন উৎস তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। সুপারি গাছ কাটার পর তৈরি গর্তে পানি জমে থাকা, বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ এবং ওয়ানটাইম কাপ ও প্লাস্টিকসামগ্রী যেখানে-সেখানে ফেলে রাখার কারণে পানি জমে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন।
নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৩৭ জন, চট্টগ্রামে ১৬৯ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩১৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৮ জন রয়েছেন।
এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৩৩৪ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, রংপুরে ৫৭ জন এবং সিলেট বিভাগে নয়জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৪৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে ১ হাজার ৩০০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। এরপর আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন।
অর্থাৎ জুনের তুলনায় আগস্টে রোগী ভর্তির সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি এবং জুলাইয়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও সংক্রমণ বৃদ্ধির গতি কমেনি।
চলতি বছরে গতকাল সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন। তাদের মধ্যে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডেঙ্গু সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে। তবে মৃত্যুর দিক থেকে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সক্ষম রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা যেহেতু বাড়ছে, তাই চিকিৎসাসেবায় যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
এদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম আরও জোরদারের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত। তিনি বলেন, সতর্ক না হলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদের টানেলে এক ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই অক্টোবর আসার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সতর্কতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন