
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই যুগে দাঁড়িয়েও নব্বই দশকের স্মৃতি আজও এক প্রজন্মকে আবেগাপ্লুত করে। বিটিভির সামনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসা, ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনা, ল্যান্ডফোনের অপেক্ষা কিংবা বিকেল হলেই মাঠে ছুটে যাওয়া—সময়ের সঙ্গে বদলে গেলেও সেই দিনগুলো আজও বেঁচে আছে স্মৃতির ভেতর।
মানুষ শুধু আশায় কিংবা ভালোবাসায় বাঁচে না, স্মৃতিও মানুষের বেঁচে থাকার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবনের কিছু সময় পেছনে ফেলে আসার পর সেই দিনগুলোর ছোট ছোট ঘটনা, মানুষ আর অনুভূতিগুলোই একসময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
বাংলাদেশের নব্বই দশকে যাদের শৈশব কিংবা কৈশোর কেটেছে, তাদের কাছে এই সময়টা শুধু একটি দশক নয়। এটি যেন ছিল এক আলাদা পৃথিবী—সরল আনন্দ, দীর্ঘ অপেক্ষা, পারিবারিক বন্ধন এবং বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য বিকেলের এক স্মৃতিময় অধ্যায়।
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দাঁড়িয়েও তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—কোথায় হারিয়ে গেল সেই নব্বই দশক?
নব্বই দশকের জীবনযাত্রা ছিল আজকের তুলনায় অনেক ধীরগতির। যোগাযোগের জন্য তখন স্মার্টফোন ছিল না, ছিল ল্যান্ডফোন। একটি ফোনকলের জন্য অপেক্ষা করা কিংবা পরিচিত কারও বাড়ির ফোনে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা—এসবের মধ্যেও ছিল আলাদা এক রোমাঞ্চ।
বাংলাদেশে ল্যান্ডফোন একসময় সীমিত মানুষের নাগালের প্রযুক্তি ছিল। অনেক এলাকায় একটি বাড়ির ফোন প্রতিবেশীরাও প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন।
আজ যোগাযোগের মাধ্যম হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকা মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলা যায়। কিন্তু দ্রুত যোগাযোগের এই যুগে অনেকের কাছেই নব্বই দশকের অপেক্ষার সেই অনুভূতি আজও বিশেষ স্মৃতি হয়ে আছে।
নব্বই দশকের জীবনে লোডশেডিং ছিল পরিচিত ঘটনা। বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘর অন্ধকার হয়ে যেত। কোথাও জ্বলত হারিকেন, কোথাও মোমবাতি। কেউ হাতপাখা নিয়ে বসতেন, আবার অনেক পরিবার উঠানে কিংবা বারান্দায় বসে গল্প করতেন।
শিশুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখত, আর বড়রা গল্পে মেতে উঠতেন। বিদ্যুৎ ফিরে আসার অপেক্ষাও ছিল সেই সময়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
আজ বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষের অস্থিরতা অনেক বেশি। কারণ আধুনিক জীবনের পড়াশোনা, অফিস, ব্যবসা, যোগাযোগ ও বিনোদন—সবকিছুই এখন প্রযুক্তিনির্ভর।
নব্বই দশকের বাংলাদেশের বিনোদনের সঙ্গে বিটিভির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একটি টেলিভিশনের সামনে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসে নাটক, সিনেমা কিংবা অনুষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতা ছিল সামাজিক ও পারিবারিক মিলনের অংশ।
শুক্রবারের সিনেমা, বিভিন্ন নাটক এবং জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ঘিরে মানুষের আলাদা আগ্রহ ছিল। নব্বই দশকের শৈশবের স্মৃতিচারণায় বিটিভি, বাংলা সিনেমা ও জনপ্রিয় নাটকগুলোর কথা এখনো ফিরে আসে।
হুমায়ূন আহমেদের নাটকও ছিল সেই সময়ের মানুষের আবেগের অংশ। বিশেষ করে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বাকের ভাই চরিত্রটি টেলিভিশনের চরিত্র হয়েও দর্শকের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
আজ একটি গান শুনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। মোবাইল ফোনের একটি ক্লিকেই লাখো গান পাওয়া যায়। কিন্তু নব্বই দশকে গান শোনার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।
ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজানো, ফিতা জড়িয়ে গেলে পেন্সিল দিয়ে সেটি ঠিক করা কিংবা প্রিয় গানের ক্যাসেট সংগ্রহ করা—এসব ছিল তখনকার সংগীতপ্রেমীদের পরিচিত অভিজ্ঞতা।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে ক্যাসেট ও ক্যাসেট প্লেয়ার বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব মাধ্যম হারিয়ে গেলেও পুরোনো প্রজন্মের স্মৃতিতে ক্যাসেট এখনো বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
নব্বই দশকের শিশুদের বিকেল মানেই ছিল মাঠ। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ রেখে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বেরিয়ে পড়া ছিল অনেকের দৈনন্দিন রুটিন।
মার্বেল, লাটিম, ঘুড়ি, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, ক্রিকেট ও ফুটবল—খেলার তালিকাও ছিল দীর্ঘ।
খেলার জন্য তখন কোনো অ্যাপের প্রয়োজন হতো না। বন্ধুরা ডাকলেই মাঠে হাজির হওয়া যেত।
নব্বই দশকের শৈশব নিয়ে সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণাগুলোতেও মাঠের খেলাধুলা, পাড়ার বন্ধু এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার বাইরে কাটানো মুক্ত সময়ের কথা উঠে এসেছে।
টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে আইসক্রিম বা হাওয়াই মিঠাই কেনার আনন্দও ছিল সেই শৈশবের অংশ। দামি খেলনা কিংবা গ্যাজেটের অভাব থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না।
নব্বই দশকের আরেকটি পরিচিত ছবি ছিল পড়ার বইয়ের ভেতরে গল্পের বই লুকিয়ে পড়া। শীতের অলস দুপুরে কিংবা পড়াশোনার ফাঁকে তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা বা অন্য কোনো প্রিয় বই নিয়ে বসে থাকার আনন্দ ছিল আলাদা।
আজ বই পড়ার মাধ্যম বদলেছে। ই-বুক, পিডিএফ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হাজারো বই পাওয়া যায়। কিন্তু হাতে ধরা বইয়ের গন্ধ, পুরোনো পাতার শব্দ আর লুকিয়ে গল্প পড়ার সেই ছোট্ট উত্তেজনা অনেকের কাছেই এখন স্মৃতি।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আজ খবর জানতে অপেক্ষা করতে হয় না। দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায় ভিডিও কলে। গান, সিনেমা ও বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম হাতের মুঠোয়।
আমরা অনেক কিছু পেয়েছি।
কিন্তু এই পাওয়ার ভিড়ে হয়তো কিছু হারিয়েও ফেলেছি।
হয়তো হারিয়েছি দীর্ঘ আড্ডা।
হারিয়েছি অপেক্ষা করার ধৈর্য।
হারিয়েছি অল্পতেই আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা।
আজ মানুষের যোগাযোগের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কাছে বসে কথা বলার সময় কমেছে। বিনোদনের মাধ্যম বেড়েছে, কিন্তু পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসার মুহূর্ত কমে গেছে।
হয়তো নব্বই দশক কোথাও হারিয়ে যায়নি।
সেটি আজও বেঁচে আছে পুরোনো গানের সুরে।
পুরোনো ছবির অ্যালবামে।
কোনো ক্যাসেটের ধুলো জমা বাক্সে।
পুরোনো ল্যান্ডফোনের রিংটোনের স্মৃতিতে।
আর সবচেয়ে বেশি—মানুষের মনে।
কারণ মানুষ আসলে শুধু একটি পুরোনো সময়কে খোঁজে না। খোঁজে সেই সময়ের মানুষগুলোকে।
সেই বন্ধুদের।
সেই বাড়িটাকে।
সেই মাঠটাকে।
সেই বিকেলটাকে।
সেই রাতের গল্পগুলোকে।
নব্বই দশক ফিরে আসবে না। ফিরবে না সেই শৈশব কিংবা সেই বিকেল।
সময় বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবন।
কিন্তু বদলায়নি স্মৃতি।
আজও কোনো পুরোনো গান শুনলে কিংবা বহুদিন আগের কোনো ছবি চোখে পড়লে মনের ভেতর অজান্তেই প্রশ্ন জেগে ওঠে—
কোথায় হারিয়ে গেল সেই নব্বই দশক?
হয়তো উত্তর একটাই—
সেই নব্বই হারিয়ে যায়নি, আমাদের স্মৃতির ভেতরেই আজও বেঁচে আছে সেই মিষ্টি সময়।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন