
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে উন্নয়ন ব্যয় পুনর্বিন্যাস, কম অগ্রাধিকার প্রকল্পের বরাদ্দ স্থগিত, প্রশাসনিক ব্যয়ে কৃচ্ছসাধন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর খাত সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় কমানোর মতো পাঁচটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছেন, আগামী রবিবার নতুন বেতনকাঠামো-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হবে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ব্যয় বাড়লেও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিয়ে সরকার আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, নতুন পে-স্কেলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো বা এমটিবিএফে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ফলে এটি সরকারের জন্য হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ নয়।
সরকার শুধু এক বছরের বাজেট পরিকল্পনা করে না। আগামী কয়েক বছরে সম্ভাব্য রাজস্ব আয়, ব্যয় এবং বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা করা হয়। নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য ব্যয়ও সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগে থেকেই বিবেচনায় রাখা হয়েছিল।
উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থ সংগ্রহে সরকারের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনা হচ্ছে উন্নয়ন বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্পগুলো পুনর্বিন্যাস করা।
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি প্রকল্প এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি এবং অনেক প্রকল্পের বাস্তব কাজও শুরু হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সব উন্নয়ন প্রকল্পের গুরুত্ব সমান নয়। জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বার্থের জন্য জরুরি প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যদিকে যেসব প্রকল্প কয়েক মাস বা এক বছর পিছিয়ে দিলেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে না, সেগুলোর বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
কম অগ্রাধিকার প্রকল্পের বরাদ্দ স্থগিতের পরিকল্পনা
সরকারের দ্বিতীয় পরিকল্পনা হলো কম গুরুত্বপূর্ণ ও ধীরগতির প্রকল্পের অর্থ ছাড় সাময়িকভাবে স্থগিত বা পিছিয়ে দেওয়া।
যেসব ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো প্রকল্প আগামী অর্থবছরেও শুরু করা সম্ভব, সেসব প্রকল্পের অর্থ আপাতত অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করা হতে পারে। একইভাবে ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের সময়ও পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।
এর মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করেও সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হবে।
প্রশাসনিক ব্যয়ে কৃচ্ছসাধন
নতুন পে-স্কেলের অর্থায়নে প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, পরামর্শক নিয়োগ, ভবন সংস্কার, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে কঠোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হতে পারে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা অনেক সময় একই ধরনের কাজের জন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করে বা আলাদা পরামর্শক নিয়োগ করে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়ানো গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।
তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল বরাদ্দ কমানোর বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচালিত বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মূল বরাদ্দ কমানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানা গেছে।
বরং এসব কর্মসূচির প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ের সুযোগ খোঁজা হবে।
রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর খাত সংস্কার
নবম পে-স্কেলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় বাড়ানোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন শুধু একটি ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নয়, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
তার মতে, ২০১৫ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকার করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিটের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটে রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটি সুস্পষ্ট ও টেকসই অর্থায়ন পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
তার মতে, বছরে নতুন পে-স্কেলের কারণে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় তৈরি হবে, তা জাতীয় বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই শুধু ঋণের ওপর নির্ভর না করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও অদক্ষতা কমানো জরুরি।
তিনি বলেন, স্বল্প মেয়াদে উন্নয়ন ব্যয় ও প্রশাসনিক ব্যয় সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো, কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়াতে হবে বলে তিনি মত দেন।
চলতি বাজেটে রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে।
এর আগে সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন জাতীয় পে-স্কেলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া। এজন্য উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন