
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউমার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জন নিহত হয়েছেন। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শিম্মিন, আড়াই বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলী।
মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫/এ নম্বর ভবনের ‘শিখা ইন’ নামের হোটেলে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের আগের রাতে মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। স্ত্রী-সন্তান ও শ্বশুরকে নিয়ে বুধবার দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর। ভিডিও কলে তিনি মা-বাবা ও আট বছরের মেয়ে দিবানীতার জন্য কেনা বিভিন্ন জিনিস দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু কে জানত, সেটিই হবে মায়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। দেশে ফেরার কথা ছিল জীবিত অবস্থায়; শেষ পর্যন্ত ফিরতে হচ্ছে তাঁর, স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুরের মরদেহ।
দেবাশীষ দত্তের বয়স হয়েছিল ৩৮ বছর। তিনি জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইন-এর কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক আজকের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় সপরিবারে থাকতেন দেবাশীষ। তাঁর বাবা দিলীপ কুমার ও মা স্বপ্না দত্ত এখন সন্তান হারিয়ে শোকে মুহ্যমান।
দিলীপ কুমার জানান, সকালে টেলিভিশনে কলকাতার হোটেলে আগুনের খবর দেখে ছেলেকে ফোন দিতে থাকেন। ফোনে রিং হলেও কেউ ধরছিলেন না। পরে জানতে পারেন, ছেলে, পুত্রবধূ, নাতি ও বেয়াই আগুনে মারা গেছেন।
তিনি বলেন, দেবাশীষ ছিলেন তাঁদের একমাত্র সন্তান এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হতো। এখন পরিবার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা তাঁরা।
অন্যদিকে দেবাশীষের আট বছরের মেয়ে দিবানীতা মা-বাবা ও ছোট ভাইকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছে। স্বজনদের সামনে সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা যান দেবাশীষ। পরে তাঁরা বেঙ্গালুরুতেও যান। দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম আলীও চিকিৎসার জন্য তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।
দেবাশীষের ভায়রা ভাই ফিরোজ হোসেন জানান, তিনি চিকিৎসা শেষে সোমবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেবাশীষ, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও আকরাম আলীর বুধবার দেশে ফেরার কথা ছিল।
কিন্তু তার আগেই কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের মৃত্যু হয়।
অগ্নিকাণ্ডে দেবাশীষের পরিবারের চার সদস্য ছাড়াও আরও তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন ঢাকার সাভারের আহমেদ বাবু, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের এসএম আলিমুজ্জামান ও রেবতী সরকার।
নিহত দুই ভারতীয় হলেন হোটেলটির কর্মচারী ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাশওয়ান এবং পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাসিন্দা যোগনারায়ণ আগরওয়াল।
ঘটনার পর হোটেলটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, ১৫/এ মির্জা গালিব স্ট্রিটের ভবনটি আগে থেকেই জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরে সেখানে একাধিক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউস গড়ে ওঠে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই হোটেলে প্রায় ৯৩ জন পর্যটক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৮১ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।
ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি বের হওয়ার পথও বন্ধ ছিল। সরু প্রবেশপথ এবং ঘুপচি কক্ষের কারণে আগুন লাগার পর ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের বের হতে চরম সমস্যায় পড়তে হয়।
প্রাথমিকভাবে একটি এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
আগুন থেকে বাঁচতে অনেকেই হোটেলের কার্নিশে আশ্রয় নেন। ঢাকার তরুণী সুমাইয়া ও তাঁর স্বামীও কার্নিশে নেমে প্রাণ রক্ষা করেন। পরে দমকলকর্মীরা মই দিয়ে তাঁদের উদ্ধার করেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর অন্তত ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত ও অচেতন অবস্থায় ছিলেন। তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ, নীলরতন সরকারসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর হোটেল মালিক বীরেশ্বর মিত্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালালেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি গাড়ি নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
ঘটনায় কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা করা হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে। পুরো ঘটনা তদন্তে পুলিশের একটি বিশেষ তদন্ত দলও গঠন করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু নিউমার্কেট নয়, কলকাতার বিভিন্ন এলাকার হোটেলও ফায়ার অডিটের আওতায় আনা হবে।
কলকাতার ১৬টি বরোতে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মীরা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ ও হাস্যোজ্জ্বল সাংবাদিক হিসেবে স্মরণ করছেন। তাঁর মৃত্যুতে আজকের পত্রিকা পরিবারও গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন