জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাসে বাড়ছে সংঘর্ষ, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন গণতান্ত্রিক চর্চা, সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার, হল নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনাগুলো সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, তিতুমীর কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। কোথাও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন, কোথাও হল নিয়ন্ত্রণ, আবার কোথাও বহিরাগত উপস্থিতি বা সাংগঠনিক আধিপত্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শিক্ষাঙ্গনে আবারও শক্তির রাজনীতি, প্রতিপক্ষকে দমন এবং প্রভাব বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষ। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও জকসুর প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা দফায় দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলার অভিযোগ ওঠে।

একই সময়ে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় হলের কক্ষ দখল ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর এবং উসকানির অভিযোগ করেছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘অদম্য জুলাই’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের উত্তেজনা দেখা যায়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রভাব ছিল। সে সময় বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা বাধার মুখে পড়ত। তবে সরকার পরিবর্তনের পর ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। এরপর থেকেই বিভিন্ন ক্যাম্পাসে নতুন করে সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্ররাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি সহিংসতায় রূপ নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন নয়; বরং গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সহনশীল ছাত্ররাজনীতি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, যে আন্দোলন তরুণদের পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছিল, সেই প্রজন্মের মধ্যেই যদি অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা বাড়তে থাকে, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, জুলাই-পরবর্তী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। যদি শিক্ষাঙ্গনে আবারও ক্ষমতার রাজনীতি, সংঘর্ষ ও দখলদারিত্বের সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিক্ষাঙ্গনকে সহিংসতামুক্ত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মতবিরোধ নিরসনে সংলাপ, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক চর্চা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।

📰 সাংবাদিক নিয়োগ চলছে

সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

  • ✔️ অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার
  • ✔️ মোবাইল দিয়ে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ
  • ✔️ স্থানীয় সংবাদ পাঠানোর সুযোগ
  • ✔️ সম্মানী ও অফিসিয়াল পরিচয়পত্র প্রদান

📞 ফোন: 01405689747

📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com

এখনই আবেদন করুন

📍 Bastobchitro24 News Team

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা ২’ নিয়ে কাজ চলছে, জানালেন জোয়া আখতার

২১ ঘণ্টা পর মুক্তি পেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী

শিক্ষকদের জন্য আসছে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

মহাসড়কে আর চলবে না থ্রি হুইলার, চালু হলো এআই ক্যামেরা

লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে দেশে ফিরলেন আরও ১৭৪ বাংলাদেশি

শেখ হাসিনা ভারতে কোন স্ট্যাটাসে আছেন, জানে না বাংলাদেশ

জ্বালানি সংকট কাটাতে লাগতে পারে আরও দুই বছর: অর্থমন্ত্রী

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলিতে আসছে নতুন নিয়ম

ইতিহাস গড়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অনন্য মিরাজ

জামায়াত-শিবির বাড়াবাড়ি করলে আজীবনের জন্য গুপ্ত থাকার ব্যবস্থা করা হবে

১০

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ বন্যা, এক সপ্তাহেই প্রাণ গেল ৫ জনের

১১

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ হাসনাতের

১২

ইউএনওর থাপ্পড়-লাঠিপেটার ভিডিও ভাইরাল, যা দেখা গেল সিসিটিভিতে

১৩

সকালে ঘুম থেকে উঠে যেসব অভ্যাস আপনাকে রাখবে সুস্থ

১৪

রাত ৮টার পর দোকান খোলা যাবে না, নতুন নির্দেশ সরকারের

১৫

রাজশাহীতে তীব্র লোডশেডিং, বাড়তি নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি

১৬

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব কে?

১৭

অবশেষে চালুর পথে শাহবাগের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল

১৮

১৯তম নিবন্ধন থেকেই শিক্ষক নিয়োগে বদল, সুপারিশ করবে না এনটিআরসিএ

১৯

এসএসসির ফল প্রকাশ, পাসের হার কমে ৬২.২৫ শতাংশ

২০