
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। শুরুতে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে এলেও তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তার দেওয়া ৫ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধও হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা জানান, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার এক কিশোর ঘটনার মাত্র ১০ দিন আগে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিল। বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম।
ড. কামরুন নাহাত শীলা বলেন, নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।
এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের পরিচয় ছিল। ঘটনার দিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর পাওনা ৫ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য তুহিনের সঙ্গে দেখা করতে যায় অপ্রতিম। একপর্যায়ে টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে অপ্রতিম তুহিনকে ধাক্কা দিলে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথার পেছনে আঘাত করে বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য। ঘটনাস্থলে আরও কয়েকজন ছিল বলেও জানা গেছে। তবে এসব তথ্যের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
আঘাতের পর অপ্রতিমকে সেখানে রেখে তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে তুহিন ও তার সহযোগীরা চলে যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। পরে অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে বের হলে তাদের সঙ্গেও তুহিনসহ অন্যরা ছিলেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মোবাইলে একাধিক ফোনকল আসতে থাকে। সেই কলের সূত্র ধরে আরও একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরেকজনকেও হেফাজতে নেওয়া হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করলেও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রাতে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। তবে অন্যদের বিষয়ে সে তখন বিস্তারিত বলতে রাজি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার মোবাইল যন্ত্রাংশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোরের নামও তদন্তে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ওই প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করত এবং তুহিনের বিষয়ে অপ্রতিমের বাবাকে প্রথম তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি তাকে খুঁজে বের করার সময় সহযোগিতা করেছিল বলেও প্রতিবেদনে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, অপ্রতিমের দেওয়া ৫ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এ বিরোধই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং অপ্রতিমের সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পর্ক—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করা হলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আইফোন, ৫ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ এবং অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড় কয়েকজনের সম্পর্কের বিষয় উঠে এসেছে। ফলে তদন্তে একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এতে কার কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তার পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন