
ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। কর্মকর্তাদের একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, হুথি ও ইরান-সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলায় ওই দেশগুলোর কাছে অঞ্চলে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের অনুরোধ করেছে সৌদি আরব।
সৌদি আরবের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি হামলা। একদিকে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, সরকারি অবকাঠামো, জনবসতি ও তেল স্থাপনাগুলো একসঙ্গে সুরক্ষা দেওয়া রিয়াদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও সীমাবদ্ধতার মুখে
সৌদি আরবের প্রধান মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রও রিয়াদের অনুরোধ পূরণে সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই আঞ্চলিক কর্মকর্তা। তার দাবি, ইরানের সঙ্গে চলমান ছয় মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুতও কমেছে।
ফলে অতীতে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ধরনের সহায়তা দিতে পারত, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে বলে কর্মকর্তাদের একজন জানিয়েছেন। তবে সৌদি সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিতের দাবি
এরই মধ্যে সৌদি আরব জানিয়েছে, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকির ভাষ্য, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয়।
সৌদি পক্ষ মক্কার নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘটনার পর মক্কাকে লক্ষ্য করে এটি দ্বিতীয়বারের মতো হামলার চেষ্টা।
তবে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সৌদি ভূখণ্ডে বিভিন্ন সামরিক ও তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করলেও পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করার কথা অস্বীকার করেছে। ফলে ড্রোনটির প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বিরোধ রয়েছে।
তেল অবকাঠামো নিয়েও বাড়ছে ঝুঁকি
হুথিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও রপ্তানি ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকায় হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন হামলার পর বন্ধ হয়ে গেছে। এই পাইপলাইন সৌদি তেলকে লোহিত সাগর উপকূলে পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি হওয়ায় সেখানে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
হুথিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে গোষ্ঠীটি সৌদি আরব ও আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুথিদের সামরিক অগ্রগতি এবং বাব আল-মান্দেবের কাছে তাদের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের নৌপথ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চার দেশের কাছে সহায়তা কেন?
সৌদি আরবের ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সহায়তা চাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে চায় রিয়াদ বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে এই চার দেশ সৌদি আরবের অনুরোধে ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, কিংবা তারা আদৌ সেনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করবে কি না—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে না যাওয়ার ইঙ্গিত
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও নজর রয়েছে। ওয়াশিংটন সৌদি বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামরিক পরিকল্পনায় সহযোগিতা বাড়াচ্ছে বলে এপি জানিয়েছে। তবে সরাসরি নতুন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। মিসর ও ওমানসহ কয়েকটি দেশ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারেও
ইয়েমেন, সৌদি আরব, ইরান ও লোহিত সাগরকে ঘিরে সংঘাত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও নৌপথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির দামও বেড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি সৌদি তেল অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
সব মিলিয়ে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত এখন শুধু দুই পক্ষের সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, তেল অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। আর ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত কমে যাওয়ার খবর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন