
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বাড়লেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মূল বেতনের তুলনায় বাড়ি ভাড়া ভাতার হারও কমছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা সব গ্রেডেই মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় এ অভিন্ন হার থাকছে না। গ্রেড যত ওপরে উঠবে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারও তত কম হবে। ফলে উচ্চ বেতন পাওয়া কর্মকর্তাদের মূল বেতন বেশি হলেও প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম থাকবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাবেন। গ্রেড-৫-এ ইনক্রিমেন্টের হার হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হবে। ওই প্রণোদনা প্রথমে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে দেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় বেতন-ভাতা আরও যৌক্তিক করার কথা বলা হয়েছে। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম আলোচিত পরিবর্তন বাড়ি ভাড়া ভাতা। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এ হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতনের তুলনায় বাড়ি ভাড়ার শতাংশ কমলেও নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। ফলে গ্রেডভেদে বাড়ি ভাতার টাকার অঙ্কও বাড়বে। অর্থাৎ বাড়ি ভাতার হার কমিয়ে মূল বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে মোট আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এ সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরির শর্ত রাখা হচ্ছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে তিনবার উচ্চতর গ্রেড সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরও ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর এ সুবিধা দেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।
চিকিৎসা ভাতাতেও বড় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সব সরকারি কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সি চাকরিজীবীরা মাসে ৩ হাজার টাকা পাবেন।
৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর বয়সিদের জন্য চিকিৎসা ভাতা হবে ৪ হাজার টাকা। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সিরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিরা ৬ হাজার টাকা পাবেন।
প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিল পেয়ে থাকেন। নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি ছোট ভাতার পরিমাণও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকবে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।
এ ছাড়া ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামোতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিদ্যমান হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করেছে সচিব কমিটি। এর মধ্যে অফিসার ও সদস্যদের প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা, শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশিরভাগ ভাতা বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।
তবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি ও বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার ক্ষেত্রে নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের অনুরূপ কাঠামো অনুসরণ করা হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে নতুন কাঠামোয় একদিকে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলক কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন