
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোবায়দা রহমান। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এর মূল মঞ্চে ‘হেলথ ইনোভেশন ফর অল: এক্সপ্যান্ডিং অ্যাকসেস টু অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ কেয়ার’ শীর্ষক প্লেনারি সেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন ডা. জোবায়দা রহমান।
তিনি বলেন, কোনো হাসপাতাল কতটা আধুনিক কিংবা সেখানে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, শুধু তা দিয়ে একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বিচার করা যায় না। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ অধিকার নয়, এটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। তাই দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে সহজে ও সাশ্রয়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ডা. জোবায়দা রহমান বলেন, অনেক রোগী জটিল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এর অন্যতম কারণ হলো, তাদের বসবাসের কাছাকাছি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না থাকা। ফলে রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহর বা বড় হাসপাতালমুখী হতে হয়। এতে চিকিৎসার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, আধুনিক টারশিয়ারি স্বাস্থ্যসেবা দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু রোগের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলা যাবে না। রোগ গুরুতর হওয়ার আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও গ্রামগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন ডা. জোবায়দা রহমান। তিনি বলেন, দেশের ৯ হাজারেরও বেশি গ্রামে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সহজে পৌঁছানো যায়—এমন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো রোগীকে চিকিৎসার জন্য শহরের দিকে ছুটে আসতে হবে—এমন পরিস্থিতি থাকা উচিত নয়। মানুষের ঘরের কাছেই প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দরকার। এ জন্য ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি এবং টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিক জীবনযাপন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
একই সঙ্গে ক্যানসার বিষয়ে মানুষের মধ্যে আরও ব্যাপক সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ডায়াবেটিস প্রসঙ্গে ডা. জোবায়দা রহমান বলেন, বাংলাদেশে এ রোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এরপরও অনেক মানুষ নিজেদের ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি না জেনেই জীবনযাপন করছেন। তাই প্রতিটি স্ক্রিনিং কর্মসূচিকে শুধু রোগ শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাউন্সেলিং, চিকিৎসা, ওষুধ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশকে ডিমেনশিয়া ও পারকিনসন্সসহ বয়োবৃদ্ধ সমাজের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা কোনো মানুষের আয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা মর্যাদার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রতিটি নাগরিকের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দেন ডা. জোবায়দা রহমান। বিশেষ করে নারীদের এ কাজে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, এসব স্বাস্থ্যকর্মী মানুষের বাড়ির কাছাকাছি থেকে রোগের স্ক্রিনিং, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে রেফার করার দায়িত্বও পালন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রবণতাও বাড়ানো যাবে।
স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, একজন রোগী যেন কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে সহজেই জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে।
চিকিৎসা শেষে রোগীকে আবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অধীনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশে একটি জাতীয় সমন্বিত রক্তব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ডা. জোবায়দা রহমান।
তার প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় স্বেচ্ছায় রক্তদান, রক্ত সংগ্রহ, সংক্রামক রোগ পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন উপাদান পৃথককরণ, পরিবহন এবং প্লাজমা ব্যাংক গড়ে তোলার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে তার মতে, উদ্ভাবন মানেই শুধু দামি যন্ত্রপাতি তৈরি কিংবা নতুন কোনো অ্যাপ তৈরি করা নয়।
রোগীদের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারে—এমন উদ্ভাবনকেই সবচেয়ে মূল্যবান উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. জোবায়দা রহমান বলেন, বাংলাদেশে মানসম্মত গবেষণা, শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যালস খাত, দক্ষ চিকিৎসক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। তবে এসব সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরিতে ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণার সঙ্গে যাচাইকরণ, যাচাইকরণের সঙ্গে নীতিমালা এবং নীতিমালার সঙ্গে বাস্তব স্বাস্থ্যসেবার সংযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, মানুষের ঘরের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব দেন ডা. জোবায়দা রহমান।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সবশেষে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের সুফল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে দিতে হবে। রোগ যেন দ্রুত শনাক্ত হয়, স্বাস্থ্যসেবা যেন মানুষের ঘরের কাছে পৌঁছে যায় এবং চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে কোনো মানুষকে যেন নিঃস্ব হতে না হয়—এটাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন