
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। যোগদানের অপেক্ষায় থাকা ১৪ হাজারের বেশি নতুন শিক্ষকের পদায়ন নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৪ হাজারের বেশি নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করে তাদের পদায়ন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের বদলি স্থগিত থাকবে। নতুন শিক্ষকদের পদায়ন সম্পন্ন হলে আবার বদলি কার্যক্রম চালু করা হবে।
বদলি চালুর পর বর্তমান নীতিমালাই বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়েও এখনই সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, নতুন করে বদলি চালুর সময় বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তন হতে পারে। সে কারণে এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, নতুন শিক্ষকরা নিয়োগ পাওয়ার পর আবার বদলি কার্যক্রম শুরু হবে। তখন কী ধরনের ব্যবস্থা বা নীতিমালার আওতায় বদলি করা হবে, সেটি পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী উপবৃত্তিসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।
তিনি বলেন, উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ের দিকে সরকার নজর রাখছে। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া মতামত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে উপবৃত্তির ক্ষেত্রে আর্থিক প্রয়োজনভিত্তিক (ফাইন্যান্সিয়াল নিড বেসিস) ব্যবস্থা চালু করা হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের প্রচেষ্টা থাকবে বলে জানান তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আওতায় আনতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়ন দর্শনে শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার সমন্বয়, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে সাক্ষরতা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
তবে এখনও উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। তাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তার মতে, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও কর্মক্ষমতায় সমৃদ্ধ নাগরিক তৈরি করা প্রয়োজন।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন, ২০১৪-এর আওতায় বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য বয়স ও প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা, কার্যকর সাক্ষরতা, জীবনদক্ষতা, জীবিকায়ন ও প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
বিদ্যালয়বহির্ভূত কিশোর-কিশোরীদের দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার উদাহরণ হিসেবে SKILFO (Skill Focused Literacy for Out of School Adolescent) পাইলট প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
কক্সবাজারে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৮২৫ জন কিশোর-কিশোরীকে ১৩টি অকুপেশনে মৌলিক সাক্ষরতা, গণনা দক্ষতা এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সাক্ষরতাকে কর্মদক্ষতা ও জীবিকায়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি মডেল তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে প্রতি জেলায় ৮০ জন করে মোট ৫ হাজার ১২০ জন ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রতিটি কোর্সে মোট ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণটি বিএনকিউএফ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে।
এই কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন কম্পিটেন্ট হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
উত্তীর্ণদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন, অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের জব লিংকেজ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬০৩ জন সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন, ৮৭৯ জন শোভন কাজে শিক্ষানবীশ হিসেবে যুক্ত হয়েছেন এবং ১ হাজার ৩০৪ জন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।
এ ছাড়া ৪৮৯ জন উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে মেন্টরের অধীনে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করছেন। আরও ৪৫৮ জন বিএনকিউএফ লেভেল-১ এবং ১০৪ জন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএসসি (ভোকেশনাল) কার্যক্রমে ভর্তি হয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সাক্ষরতার সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছে সরকার। অন্যদিকে ১৪ হাজারের বেশি নতুন শিক্ষককে পদায়নের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যমান শিক্ষক বদলি কার্যক্রম আপাতত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন