
প্রায় দেড় দশকের শাসনের শেষ প্রান্তে এসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে একের পর এক কৌশল নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান, ধারাবাহিক বৈঠক এবং ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি প্রতিহত করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টের জনজোয়ারের মুখে ভেঙে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত রাজসাক্ষ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এসেছে, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে আন্দোলনের সমন্বয়কদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও এসব সাক্ষ্যে উঠে আসে।
রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে নিয়মিত কোর কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। এসব বৈঠকে আন্দোলনের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হতো। বৈঠকে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি আদালতে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ৪ আগস্ট সকালে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আন্দোলনের পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে একই দিন রাতে আবারও গণভবনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে রাজধানীতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে রাজসাক্ষ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আদালতে আরও বলেন, বৈঠকের পর সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে গিয়ে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ৫ আগস্ট সকালে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করেন। পরে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং দুপুরের মধ্যে তিনি জানতে পারেন, শেখ হাসিনা আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকছেন না।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম তার সাক্ষ্যে বলেন, শুরুতে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ, যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া এবং সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের আশঙ্কায় কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
তিনি জানান, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকামুখী হতে থাকেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও ক্রমবর্ধমান জনসমাগমের মুখে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, গুলি ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। পরে শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতা সমবেত হন। একপর্যায়ে গণভবনের দিকে অগ্রসর হওয়া জনস্রোতের মধ্যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন বলে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে উঠে আসে।
পরবর্তীতে জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলার বিচার শুরু হয়। এসব মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্য এবং রাজসাক্ষীদের জবানবন্দিতে আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের নানা ঘটনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির বিবরণ উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৪ আগস্টের বৈঠক এবং আন্দোলন ঠেকাতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও ৫ আগস্টের জনসমাগম দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সেই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতার সূচনা করে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন