
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তথ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন কনটেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত বিটিভির মোট আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, যেখানে একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ টাকারও বেশি। গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্যও একই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়—প্রতিবছরই আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থেকে যাচ্ছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য কেবল মুনাফা অর্জন নয়; জনস্বার্থ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াও এর অন্যতম দায়িত্ব। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দক্ষতা ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
প্রশ্ন হলো, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কয়েক কোটি টাকার আয় কেন? এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী?
প্রথমত, বিটিভিকে দর্শককেন্দ্রিক ও যুগোপযোগী কনটেন্ট তৈরিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে দর্শকের বড় একটি অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অভ্যস্ত। তাই নাটক, তথ্যচিত্র, খেলাধুলা, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, টকশো এবং সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক মানসম্মত অনুষ্ঠান নির্মাণের মাধ্যমে দর্শকসংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। দর্শক বাড়লে বিজ্ঞাপন আয়ও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
দ্বিতীয়ত, বিটিভির বিশাল আর্কাইভ একটি মূল্যবান সম্পদ। স্বাধীনতা যুদ্ধ, ঐতিহাসিক ভাষণ, পুরোনো নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিশেষ ডকুমেন্টারিগুলো ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাজারজাত করা হলে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে ইউটিউব ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে কনটেন্ট সম্প্রসারণ করে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।
তৃতীয়ত, বিটিভির স্টুডিও, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং অন্যান্য সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বেসরকারি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন সংস্থাকে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় এসব সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কোটি কোটি বাংলাদেশি একটি বড় দর্শকগোষ্ঠী, যাদের কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপের নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যয়কে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না; সেটিকে কীভাবে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা যায়, সেই পরিকল্পনাই হতে হবে মূল লক্ষ্য। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সফলতা শুধু ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হওয়া নয়, বরং জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
বাংলাদেশ টেলিভিশন দেশের ঐতিহ্যের অংশ। সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ব্যবসায়িক চিন্তার সমন্বয়ে বিটিভিকে একটি আত্মনির্ভরশীল, শক্তিশালী এবং সময়োপযোগী গণমাধ্যমে পরিণত করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, কার্যকর সংস্কার এবং বাস্তবায়নের আন্তরিক উদ্যোগ।
বিশ্লেষণ: আহসান হাবিব
সহ-সম্পাদক, বাস্তবচিত্র ২৪ নিউজ
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন