
পদ্মা নদী ঘিরে গড়ে ওঠা রাজবাড়ীর মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পদ্মা ব্যারাজ। নদীভাঙন, বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও নৌযোগাযোগের নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা করে আসছেন এ অঞ্চলের মানুষ। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাবনা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু রাজবাড়ী নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ২৪ জেলার কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, শিল্প ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর এলাকায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন এবং জনসভাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দীর্ঘদিনের এই প্রকল্প। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ায় স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তিনি পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি।
রাজবাড়ীসহ পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল কৃষিনির্ভর। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ও বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকটে পড়তে হয় কৃষকদের। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে পানি সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেচ সুবিধা বাড়লে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আসার পাশাপাশি একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনাও বাড়বে। ধান, পাট, গম, ভুট্টা, সবজি ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের উৎপাদন বাড়লে কৃষকের আয়ও বাড়তে পারে।
স্থানীয় কৃষক শাহীন মন্ডল বলেন, পদ্মা ব্যারাজ হলে সেচের পানির সংকট কমবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে। এতে কৃষকরাই বেশি উপকৃত হবেন।
আরেক কৃষক হামিদল ইসলাম বলেন, সেচ সুবিধা বাড়লে উৎপাদন খরচ কমবে। দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
পদ্মার ভাঙন রাজবাড়ীর মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীব্র স্রোত ও ভাঙনে প্রতিবছর বসতভিটা, ফসলি জমি, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গোয়ালন্দ, দৌলতদিয়া, দেবগ্রামসহ পদ্মাতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এর প্রভাব রয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে নদীর পানি প্রবাহ ও ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ ও বন্যা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
পদ্মা নদী দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটসহ বিভিন্ন ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। তীব্র স্রোত, নাব্যতা সংকট ও নদীভাঙনের কারণে অনেক সময় নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়।
ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা ও নাব্যতা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে নৌযোগাযোগে স্থিতিশীলতা আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পণ্য পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও আন্তঃজেলা বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজবাড়ীর সঙ্গে পাবনা জেলার সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সময়ও কমতে পারে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে।
পদ্মা নদী ও এর শাখা-প্রশাখা মৎস্যসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে ব্যারাজ নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হলে মাছের প্রজনন, বিচরণ ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত সমীক্ষা, মাছের চলাচলের ব্যবস্থা, অভয়াশ্রম সংরক্ষণ এবং জেলেদের জীবিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন।
কৃষি ও নৌযোগাযোগের উন্নয়নের পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ ঘিরে নতুন শিল্প ও ব্যবসার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়লে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
রাজবাড়ী ও আশপাশের জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে। এতে তরুণদের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় এমাদ আলী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ হলে কৃষির পাশাপাশি যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে।
পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বর্ষাকালে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করা। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে পাংশার হাবাসপুর এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গত ১৩ মে পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১৫ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনঃখনন এবং ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর পাংশার হাবাসপুরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সাইট পরিদর্শনে আসেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মসহ সংশ্লিষ্টরা।
রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হারুন অর রশিদ বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে রাজবাড়ীসহ আশপাশের জেলার কৃষি ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। নৌযোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারেও এর ভূমিকা থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, পদ্মা ব্যারাজ রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, নৌযোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সাইট পরিদর্শন শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, খুব শিগগিরই—সম্ভবত আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চ মাসের কোনো এক সময়ে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাংশার হাবাসপুরে এসে পদ্মা ব্যারাজের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আগের পরিকল্পনার মতো নয়, নতুন চিন্তা ও নকশায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ডিজাইন ফেজের কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে পদ্মা ব্যারাজকে ঘিরে রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা এখন নতুন করে জোরালো হয়েছে। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি পরিবেশ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন