
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শতবর্ষী মাদারগঞ্জ হাট একসময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষিপণ্য, গবাদিপশু, পান-সুপারি, স্বর্ণালংকার, পুরাতন সাইকেল ও মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের পণ্যের কেনাবেচায় প্রতি হাটবারে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত এই হাট। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত পরিচালনা এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাবে বর্তমানে হাটটি তার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মাদারগঞ্জ হাটে প্রতি শনিবার ও বুধবার নিয়মিত হাট বসে। এখানে ধান, পাট, সবজি, গরু-ছাগল, পান-সুপারি, স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি পুরাতন সাইকেলের একটি বড় বাজার এবং দেড় ডজনেরও বেশি পুরাতন মোটরসাইকেলের শোরুম রয়েছে। এছাড়া ১০, ১১ ও ১২ নম্বর ইউনিয়নের কৃষকদের জন্য নিয়োজিত সার ডিলারদের কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরে এই হাটকেন্দ্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এতে হাটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষকদেরও নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের প্রধান চৌরাস্তা কলেজ মোড় এবং আশপাশের সড়কের বড় অংশ অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট বসানো হয়েছে। ফলে হাটের দিনে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অনেক সময় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে, যা জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
কলেজ মোড়ের পাশেই অবস্থিত মাদারগঞ্জ কলেজ, মাদারগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, মাদারগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীকে যানজট ও বিশৃঙ্খলার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একই অবস্থা মাদারগঞ্জ সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা মোড়েও, যেখানে অবৈধ দোকান ও টেম্পো স্ট্যান্ড চলাচল আরও বিঘ্নিত করছে।
হাটের পরিবেশও অত্যন্ত নাজুক। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষাকালে কাদাপানি জমে থাকে, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন ক্রেতা-বিক্রেতারা। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, গবাদিপশু ও ব্রয়লার মুরগি জবাইয়ের বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো হাট এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এতে জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
করোনাকালীন সময়ে বিশুদ্ধ পানির জন্য মোটর ও পানির ট্যাংক স্থাপন করা হলেও সেগুলো বর্তমানে অকার্যকর। ফলে হাটে আসা হাজারো মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সম্প্রতি এলাকাবাসীর উদ্যোগে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি দখলকৃত রাস্তা থেকে প্রভাবশালীদের নির্মিত বাড়িঘর ও দোকানপাট অপসারণ করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এছাড়া গত ২৬ জুন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিবেশ উন্নয়ন, যানজট নিরসন এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন জমা দেন।
আবেদনকারী ও সাবেক সেনা সদস্য গোলাম মওলা প্রধান বলেন, “মাদারগঞ্জ হাটের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করছি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছর কোটি টাকার সরকারি ইজারা আদায় হলেও সেই অর্থের প্রতিফলন হাটের উন্নয়নে দেখা যায় না। নেই পরিকল্পিত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কিংবা কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, মাদারগঞ্জ হাটকে দখলমুক্ত করে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত পার্কিং এবং কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হলে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী হাট আবারও তার হারানো প্রাণচাঞ্চল্য ও সুনাম ফিরে পাবে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন