
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা-২০২৬’ গ্রহণ করেছেন জোটের নেতারা। ঘোষণায় কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে একতরফা শুল্কনীতির সমালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা ও সমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গৃহীত ঘোষণায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়। ব্রিকসের সম্মিলিত নথিতে ‘একতরফা যুদ্ধমূলক কর্মকাণ্ড’ প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার আহ্বানও জানিয়েছে ব্রিকস। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, অবাধে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে জোটটি।
সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, দুই দশকে ব্রিকস বিশ্বমঞ্চে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে জোটটি আরও পরিণত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে কূটনীতি ও আলোচনার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ব্রিকস। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবি তুলে মোদি বলেন, এ বিষয়ে আর দেরি করা উচিত নয়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবি জানিয়ে আসছে।
সম্মেলনের প্রথম দিন ব্রিকসের আলোচনায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মোদি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো। অথচ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা এখনো সীমিত। তিনি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, শীর্ষে থাকা কয়েকটি দেশ অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিচের দিকে থাকা দেশগুলো সেসব সিদ্ধান্তের প্রভাব বহন করে।
এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সংঘাত প্রসঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পক্ষে নয়।
শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত চীন। তার মতে, এ সংঘাত ওই অঞ্চলের মানুষের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
শি জিনপিং ব্রিকস দেশগুলোকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে সমর্থন এবং সব ধরনের সুরক্ষাবাদ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান। পাশাপাশি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করার কথাও বলেন তিনি।
সাত বছর পর ভারত সফরে যাওয়া শি জিনপিং ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রস্তাব দেন। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ব্রিকস বিজনেস ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, বিশ্ব বর্তমানে জটিল সময় ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড ও নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে বলেন, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে কোনো দেশ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে অন্য দেশের বৈধ বাণিজ্যে বাধা দিতে না পারে।
ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতে যাওয়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় ইসলামি বক্তা জাকির নায়েককে প্রত্যর্পণের বিষয়টিও উঠেছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, দুই দেশের স্বার্থ ও সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রত্যর্পণের দাবি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা বোঝাপড়া রয়েছে। তবে আইনের শাসন এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বকে সম্মান করেই বিষয়টি এগিয়ে নিতে হবে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন