
কমিশন বৃদ্ধি, এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক হয়রানি ও অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এ দুই দিনের মধ্যে দাবি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান। তিনি জানান, সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টানা দুই দিন সারা দেশের এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ থাকবে। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।
এমন সময় এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো, যখন বাজারে এলপিজির দাম নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা কমিশন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকার দাবি করেছে।
সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা করার দাবি
সংগঠনের সভাপতি সেলিম খান বলেন, প্রায় পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পরিবেশকদের জন্য প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর জ্বালানি তেল, পরিবহন, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, গুদামভাড়া ও লাইসেন্স ফিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি অব্যবহৃত সিলিন্ডার পড়ে থাকায় ব্যবসায়ীদের লোকসান হচ্ছে।
এসব ব্যয় বিবেচনায় সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর কমিশন বাড়ানোর দাবিতে বিইআরসির কাছে চিঠি দেয় সংগঠনটি। চিঠিতে ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে প্রায় ৫০ টাকা খরচ হয়। সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে আরও ৩৫ টাকা ব্যয় হয়। কর্মচারীর বেতন, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খাতে খরচ হয় প্রায় ২৫ টাকা। এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
কোম্পানির ইচ্ছামতো দাম পরিবর্তনের অভিযোগ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও কিছু কোম্পানি পাঁচ থেকে সাত দিন পর আবার নিজেদের মতো করে দাম পরিবর্তন করে। এতে বাজারে মূল্য নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং পরিবেশকেরা আর্থিক ও ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পড়েন।
সমিতির দাবি, কোনো কোম্পানি এক মাসে একাধিকবার দাম সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানির চালানে সিলিন্ডারের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করতে হবে, যাতে ক্রয়মূল্য নিয়ে অস্পষ্টতা না থাকে।
যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের কাছ থেকে ন্যায্য পরিবহনভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
সরবরাহসংকট ও খালি সিলিন্ডার নিয়ে উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে এলপিজি সরবরাহ এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা।
সেলিম খানের দাবি, বর্তমানে ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি ছাড়া বেশির ভাগ কোম্পানি নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অনেক কোম্পানি এলসি খুলতে না পারায় সারা দেশে কয়েক লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে অক্ষম কোম্পানিগুলোর খালি সিলিন্ডারে সরকারি উদ্যোগে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে সমিতি। ব্যবসায়ীদের মতে, অব্যবহৃত সিলিন্ডার কাজে লাগানো গেলে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করতে সহায়তা হতে পারে।
তবে দেশে এলপিজির সামগ্রিক সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতি ও আমদানিকারকদের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। পরিবেশকেরা সরবরাহসংকটের অভিযোগ তুললেও লোয়াব দেশে আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার কথা জানিয়েছে।
বেশি দামে বিক্রি নিয়ে ভোক্তাদের অভিযোগ
গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে অনেক জায়গায় নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কাছ থেকেও বেশি দামে এলপিজি বিক্রির তথ্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে একদিকে পরিবেশকেরা কমিশন ও সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন, অন্যদিকে ভোক্তাদের জন্য নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, কমিশন ও পরিচালন ব্যয়ের বাস্তবসম্মত সমাধান না হলে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা কঠিন। অন্যদিকে, আমদানিকারকদের বক্তব্য হলো দেশে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ব্যবসায়ীদের সাত দফা দাবি
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের উত্থাপিত সাত দফা দাবি হলো—
১. জ্বালানি তেলের দাম, লাইসেন্স ফি, পরিবহন ও ওঠানো-নামানোর খরচ এবং অব্যবহৃত সিলিন্ডারের লোকসান বিবেচনায় সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণ।
২. কোনো কোম্পানি এক মাসে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে কার্যকর করা।
৩. দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে অক্ষম কোম্পানির খালি সিলিন্ডারে সরকারিভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরার ব্যবস্থা করা।
৪. কোম্পানির চালানে সিলিন্ডারের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করা।
৫. যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের কাছ থেকে ন্যায্য পরিবহনভাড়া নিশ্চিত করা।
৬. সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও শুধু গাড়ির রেলিংয়ের কারণে সিলিন্ডার বহনকারী পিকআপ বা ট্রাকের বিরুদ্ধে মামলা না দেওয়া।
৭. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘অনৈতিক ও অযৌক্তিক’ জরিমানা আরোপ বন্ধ করা।
আগেও ধর্মঘটে গিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা
এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার প্রতিবাদে সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক এবং দাবি পূরণের আশ্বাসের পর ওই দিন বিকেলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
এবারও দুই দিনের দোকান বন্ধের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এলপিজির দাম, কমিশন ও সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক এবং ভোক্তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের কর্মসূচিতে দোকান বন্ধ থাকলে গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস সংগ্রহে ভোক্তাদের ভোগান্তি তৈরি হতে পারে। তবে কর্মসূচি কতটা বিস্তৃতভাবে পালিত হবে এবং এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় কোনো সমাধান আসে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন