
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ ঘটনার জেরে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এমন তথ্য জানিয়েছে সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় সমালোচনা।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজ হাতে অস্ত্র নিয়ে অভিযানে অংশ নেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার ও বিএনপিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওই দিন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকা পরিদর্শন করে সেবার মান এবং পরিচ্ছন্নতা উন্নয়নে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। একই দিনে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনকে লোকজনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওর একটি অংশে এক তরুণকে লাথি মারার দৃশ্যও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। তবে ভিডিওতে শোনা গুলি করার হুমকি কে দিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনায় আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালায় আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহনের সুযোগ থাকলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
সমালোচনার পর রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
ইশরাক বলেন, এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। অভিযানের আগে মাদক কারবারিদের গুলি চালানোর আশঙ্কার কথাও জানতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলের কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইশরাক আরও দাবি করেন, তাঁর ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত। অভিযানে কয়েকটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ, মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য সামগ্রী জব্দ এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইশরাকের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের আগের বক্তব্যের কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে অভিযানের বিষয়ে জানাননি; পরে পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে।
অন্যদিকে, ইশরাক সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন। ফলে অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়, অস্ত্র প্রদর্শনের পরিস্থিতি এবং অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জেরে এর আগে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এবার ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এল।
তবে ইশরাকের পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সূত্রনির্ভর তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিএমপির তদন্তের ফল এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পরই এ ঘটনায় আইনগত ও প্রশাসনিক পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন