
ইউরোপের ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ায় শিক্ষা, আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাবের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন তরুণ ও সাধারণ মানুষ। দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ আলাদা হলেও সাশ্রয়ী জীবন, উন্নত জনসেবা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এসব আন্দোলনের অন্যতম সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কিছু জায়গায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সংঘর্ষ ও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
ফ্রান্সে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ক্লাস, শিক্ষকের ঘাটতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও পেনশনসংক্রান্ত দাবি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকসংকটের কারণে অনেককে দীর্ঘ সময় নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে।
ফ্রান্সের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবির মধ্যে রয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, মজুরি বৃদ্ধি এবং পেনশন বাড়ানো।
বিক্ষোভের চাপে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের পরও বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি।
স্পেনে বাড়িভাড়া ও উচ্ছেদের প্রতিবাদ
স্পেনে আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ তীব্র হয়েছে। বাড়ির দাম ও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে তরুণ, শিক্ষার্থী এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্বাধীনভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি বিনিয়োগ তহবিল তাঁর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ ঘটনা আবাসনবাজারে বিনিয়োগ তহবিলের প্রভাব এবং ভাড়াটেদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসনকে কেবল বিনিয়োগের পণ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমানো।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকার আবাসন সংকট মোকাবিলায় জরুরি আইন আনার চেষ্টা করলেও বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতায় প্রস্তাবটি পার্লামেন্টে বাধার মুখে পড়ে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা আবাসন সমস্যার সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ
স্পেনের প্রতিবেশী পর্তুগালেও আবাসন সংকট নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী লিসবনে বাড়ির দাম ও ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির ফলে তরুণদের জন্য বাড়ি কেনা এবং অনেক পরিবারের জন্য ভাড়া দিয়ে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভকারীরা আবাসনকে সাশ্রয়ী করার জন্য কার্যকর সরকারি উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের উদ্বেগ, আবাসনের দাম আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকলে তরুণদের আর্থিক স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে।
ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সংঘর্ষ
ইতালির মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবারের মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও রাস্তার পেভমেন্টের ব্লক ছুড়েছেন। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইতালিতেও দ্রব্যমূল্য, আবাসন এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাই সহিংসতায় জড়িত ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সহিংস কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, চাকরি ও শিক্ষার মান নিয়ে আন্দোলন
আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বিক্ষোভকারী।
দেশটির উপকূলে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিক্ষোভকারীদের একাংশ সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন একসঙ্গে বিভিন্ন দেশে ক্ষোভ বাড়ছে?
পাঁচটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবু কয়েকটি সাধারণ সমস্যা মানুষের ক্ষোভকে তীব্র করছে।
প্রথমত, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি তরুণদের জন্য স্বাধীনভাবে জীবন শুরু করা কঠিন করে তুলছে। আয় ও বাড়িভাড়ার মধ্যে ব্যবধান বাড়লে শিক্ষা শেষ করে চাকরি পাওয়া তরুণদেরও পরিবারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মান ও সুযোগের বৈষম্য ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। শিক্ষকসংকট, দুর্বল অবকাঠামো কিংবা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য শিক্ষার্থীদের মনে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাওয়া কঠিন।
তৃতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থানের চাপ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। খাবার, বাসস্থান, যাতায়াত ও জ্বালানির পেছনে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হলে সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুযোগ সংকুচিত হয়।
চতুর্থত, রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমতে পারে।
বিক্ষোভের পরিণতি কোন দিকে?
ফ্রান্সে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্পেনে আবাসন আইন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। পর্তুগালেও বাড়ির দাম ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো হচ্ছে। ইতালি ও আলবেনিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে কয়েকটি নীতিগত ঘোষণা দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা কঠিন। আবাসন সরবরাহ বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনসেবার মান উন্নয়নে ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তাই শুধু তাৎক্ষণিক অসন্তোষের প্রকাশ নয়; তরুণদের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সরকারগুলো এসব দাবির কার্যকর সমাধান দিতে পারে কি না, তার ওপরই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও আল জাজিরা।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন