
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী দিল্লি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার নেতাকর্মীরা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল নিয়ে গেলে পুলিশ তাদের পথ আটকে দেয়। একই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্র ও নাগরিক সংগঠনগুলোও।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো, যান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং মেট্রোর কয়েকটি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেয় কর্তৃপক্ষ। রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন ঘিরে রাজধানীতে কয়েক দিন ধরেই উত্তেজনা চলছে।
জ্ঞানেশের পর মোদি-অমিত শাহের পালা: রাহুল গান্ধী
সোমবারের বিক্ষোভে রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন থামবে না। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হবে।
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক চাপের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপের কারণে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নির্বাচন কমিশনের অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। অভিযোগগুলো এখনো বিরোধী নেতাদের বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে চলমান প্রতিবাদই মূল আন্দোলন এবং তাঁরা থামবেন না।
সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল, পথে বাধা
সোমবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়ার পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন তাঁরা।
মিছিলে কংগ্রেসের নেতাদের পাশাপাশি সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতারাও অংশ নেন। বিরোধী নেতাদের একটি যৌথ আবেদনেও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগ ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।
মিছিলটি সুপ্রিম কোর্টের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে দেয়। ফলে মিছিলকারীরা নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। এ সময় আশপাশের এলাকায় বহু বিক্ষোভকারী অবস্থান করেন।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ
বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। যাঁদের নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে, তাঁদের ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সব নামই বৈধ ভোটারের—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য ও যাচাইপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও সংশোধনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান ছাড়া বিরোধীদের উত্থাপিত সংখ্যাকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিয়ে টানাপোড়েন
দিল্লির পরিচিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি পাওয়া নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের টানাপোড়েন চলছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সেখানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে চায়।
কিন্তু দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার পর বিকল্প কয়েকটি স্থানে প্রতিবাদ আয়োজনের কথা জানায়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিকল্প স্থান হিসেবে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, যন্তর মন্তরের মতো কেন্দ্রীয় ও পরিচিত প্রতিবাদস্থল থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে দিলে আন্দোলনের দৃশ্যমানতা কমতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিবাদের স্থান পরিবর্তন করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না।
সিজেপির নেতারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট দিন ও সময় জানাতে পুলিশের কাছে দাবি জানিয়েছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুমতি না মিললে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তবে এসব কর্মসূচির চূড়ান্ত সময়সূচি পুলিশের অনুমতি ও সংগঠনের পরবর্তী ঘোষণার ওপর নির্ভর করছে।
আটক ও পুলিশের আচরণ নিয়ে অভিযোগ
গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। ১০ অক্টোবরের প্রতিবাদ কর্মসূচির আগে ও চলাকালে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে।
এদিকে কয়েকজন আন্দোলনকারী অভিযোগ করেছেন, আটক করার পর পুলিশি হেফাজতে তাঁদের মারধর করা হয়েছে। ‘রেভল্যুশনারি ওয়ার্কার্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’র সদস্য নওরিন সংবাদমাধ্যম স্ক্রলকে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেন, পুলিশ ভ্যানে নেওয়ার পর কয়েকজন নারী বিক্ষোভকারীকে মারধর করা হয়। তাঁর বর্ণনায়, অরণ্যা নামে এক আন্দোলনকারীকে গলা চেপে ধরা ও শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনা ঘটেছে।
নওরিনের অভিযোগ অনুযায়ী, অন্য কয়েকজন নারীও পুলিশের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য বা স্বাধীন তদন্তের ফল এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট আন্দোলনকারীর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
কলকাতাতেও বিক্ষোভের প্রস্তুতি
দিল্লির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাতেও নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাজাবাজার থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত মিছিল হওয়ার কথা। এতে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অংশ নিতে পারেন বলে দলের এক নেতার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির বিক্ষোভেও অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদ দিল্লির বাইরে অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা
বিক্ষোভের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে অনড় রয়েছে সিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর একাংশ। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহাল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহি প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রশাসনের সামনে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও জনচলাচল সচল রাখার প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবাদস্থল নির্ধারণ, বিক্ষোভের অনুমতি এবং আটকসংক্রান্ত ঘটনাগুলো এ বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
এখন নজর থাকবে বিরোধীদের যৌথ আবেদনের বিষয়ে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ, নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া এবং যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ আয়োজনের অনুমতি নিয়ে দিল্লি পুলিশের সিদ্ধান্তের দিকে।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন