
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার নিয়ে প্রকাশিত এবারের ফলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে। বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অন্যদিকে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
শুধু পাসের হার কমাই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ কমেছে ২৯ হাজার ১৩টি বা প্রায় ৪২ শতাংশ। একই সময়ে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে আলোচনায় এসেছে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই দুই বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন ফেল করেছেন।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, ইংরেজি বিষয়ে দীর্ঘদিনের দুর্বল ভিত্তি, নিয়মিত অনুশীলনের অভাব এবং পাঠদানের সীমাবদ্ধতা অনেক শিক্ষার্থীর ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে আইসিটি বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ধারণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতিও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস অনুসরণ করায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির চাপ বেড়েছিল। দীর্ঘ সিলেবাসের সব বিষয় যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে অনেক শিক্ষার্থী হিমশিম খেয়েছেন। বিশেষ করে যারা নিয়মিত পড়াশোনার বাইরে ছিলেন, তাদের জন্য প্রস্তুতির ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষাভীতি এবং মানসিক প্রস্তুতির অভাবও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব কারণের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে শিক্ষার্থীভিত্তিক তথ্য ও বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এবারের ফল বিপর্যয়ের পেছনে খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতিও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, খাতা মূল্যায়নে ঢালাওভাবে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার পরিবর্তে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের ধারণা, মূল্যায়নে কঠোরতা এবং প্রশ্নপত্রের মান ও ধরনে পরিবর্তনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত নম্বর অর্জন করতে পারেননি। তবে যথাযথ মূল্যায়নকে ফল খারাপ হওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-দক্ষতা, পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ওই সময় কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকা ও পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়েছিল বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের অভিমত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হলে পাঠদানের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে থাকলে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এবারের ফলাফলের সঙ্গে এসব পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বোর্ডটিতে পাসের হার কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। গত ১৫ বছরের মধ্যে এটিকে বোর্ডটির সর্বনিম্ন পাসের হার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বছর বোর্ডটিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে। বোর্ডটির তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৬১ হাজার ৮৯৪ জন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা উত্তরপত্রে যা লিখেছেন, সে অনুযায়ী নম্বর পেয়েছেন; কাউকে বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডেও ফলাফলের চিত্র উদ্বেগজনক। বোর্ডটিতে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন। এ ছাড়া ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে মানবিক বিভাগে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। এ বিভাগে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। অন্যদিকে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন। বিভাগটিতে মোট পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠদানের পরিবেশ এবং বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ কিংবা পাসের হার নিয়ে আলোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ভিত্তি শক্তিশালী করতে নিয়মিত অনুশীলন, মানসম্মত পাঠদান, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে সাময়িকভাবে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
কারণ, একটি পরীক্ষার ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসাব নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং সামগ্রিক শিক্ষার মান সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এবারের ফলাফল তাই কেবল পাসের হার কমার ঘটনা নয়, বরং দেশের মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন