
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও সরকারি অনুদান চালু হয়নি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শূন্য পদে নিয়োগ পাওয়া ১ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষকের। প্রায় এক বছর ধরে অনুদানের অপেক্ষায় থাকা এসব শিক্ষক আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনিক নানা ধাপ পেরিয়ে অনুমোদন মিললেও অনুদান ছাড়ের কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
তবে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনুমোদিত তালিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠায় তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। যোগ্য শিক্ষকদের অনুদান দ্রুত ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে শূন্য পদে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে ১ হাজার ৬৯০টি শূন্য পদের শিক্ষকের তথ্য পাওয়া যায়।
পরে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সাত সদস্যের কমিটি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ সদস্যের কমিটির প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর এসব শিক্ষককে অনুদান দেওয়ার বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু আদেশ জারির পরও তাঁদের অনুদান চালু হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষকদের দাবি, তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, কমিটির সুপারিশ ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও অনুদান না পাওয়ায় তাঁরা হতাশ। দীর্ঘদিন বিনা অনুদানে পাঠদান চালিয়ে যেতে গিয়ে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কোডপ্রাপ্ত প্রায় ৯ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার মধ্যে ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠান অনুদানভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ৩ হাজার ৩০০ টাকা করে অনুদান পান।
প্রতি প্রতিষ্ঠানে চারজন শিক্ষক ধরে অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ জন। ১৯৯৪ সালে অনুদান কার্যক্রম চালুর পর মৃত্যু, অবসর, পদত্যাগ ও বহিষ্কারসহ বিভিন্ন কারণে অনেক পদ শূন্য হয়।
২০২৩ সালে ৫৬টি জেলার ১ হাজার ৮৫০টি শূন্য পদ পূরণ করা হয়। তবে বাকি আট জেলায় দীর্ঘদিন শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৬৯০টি শূন্য পদের শিক্ষকের তথ্য পাওয়া যায়।
শিক্ষকদের বক্তব্য, অনুদানের পরিমাণ দিয়ে একটি পরিবারের সব খরচ মেটানো সম্ভব নয়। তবু স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য এই অর্থ খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার মতো জরুরি ব্যয় সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই সহায়তা না পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও কেন শিক্ষকদের অনুদান ছাড় হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, “প্রার্থীরা আমার কাছে এসেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও কেন তাদের অনুদান ছাড় হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি ছুটি শেষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। যারা প্রাপ্য তাদের অনুদান দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান জানিয়েছেন, ১ হাজার ৬৯০ জনের তালিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠায় তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তের পর কিছু শিক্ষককে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তালিকা চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে সভা করার চেষ্টা চলছে। নভেম্বরের মধ্যে শিক্ষকদের অনুদান দেওয়ারও চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের মহাসচিব মো. রেজাউল হক বলেন, নিয়োগ বা তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে অভিযোগের কারণে বৈধ নিয়োগ ও কাগজপত্র থাকা শিক্ষকদের অনির্দিষ্টকাল অনুদানের বাইরে রাখা যুক্তিসংগত নয়।
তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা প্রকৃতপক্ষে অনুদান পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াও দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কমিটির সুপারিশ থাকার পরও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। দ্রুত যাচাই-বাছাই শেষ করে অনুদান চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের যুগ্ম মহাসচিব মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি শুধু অনুদানের অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১ হাজার ৬৯০টি পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকদের অনুদান চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের ভাগ্য নির্ধারণে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিযোগ যাচাই এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নভেম্বরের মধ্যে অনুদান দেওয়ার চেষ্টা করার কথা জানানো হলেও অর্থ ছাড়ের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
শিক্ষকদের প্রত্যাশা, যাচাই-বাছাইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করে যোগ্যদের অনুদান চালু করা হবে। এতে একদিকে তাঁদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে, অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাদানে যুক্ত এসব শিক্ষকও ন্যায্য আর্থিক সহায়তা পাবেন।
প্রকাশের আগে যাচাই করুন: ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর জারি করা আদেশ, ১ হাজার ৬৯০ জনের তালিকার বর্তমান অবস্থা এবং নভেম্বরের মধ্যে অনুদান ছাড়ের প্রতিশ্রুতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সারা বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
📞 ফোন: 01405689747
📧 ইমেইল: news@bastobchitro24.com
📍 Bastobchitro24 News Team
মন্তব্য করুন